Wellcome to National Portal
মেনু নির্বাচন করুন
Main Comtent Skiped

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত

১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার তারিখ বাতিলের ঘোষনা দিলে  সাথে সাথে সমগ্র বাংলাদেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে; টাঙ্গাইলেও শুরু হয় জঙ্গী মিছিল। মিছিলের স্লোগান ছিল ‘‘ইয়াহিয়ার ঘোষনা বাঙ্গালীরা মানবে না’’, ‘‘বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর, আমরা গড়ব নতুন দেশ নাম হবে তার বাংলাদেশ’’। ছাত্র যুবক জনতা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন থানা ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রামগঞ্জে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এই সকল সামরিক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন প্রধানত সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যবৃন্দ। মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজে সামরিক প্রশিক্ষণ  হয়। ক্যাডেট কোরে ড্যামি রাইফেল দিয়ে মূলতঃ এই প্রশিক্ষণ চলতে থাকে।


বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের যুগান্তকারী ভাষণের পর পরই টাঙ্গাইল শহরে বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু মোহাম্মদ এনায়েত করিম, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে জয় বাংলা বাহিনীর কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। এখানে উল্লেখ থাকে যে, জনাব এনায়েত করিম ও কাদের সিদ্দিকী দুজনেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একসময় কর্মরত ছিলেন। উক্ত কুচকাওয়াজে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দপ্তর সম্পাদক জনাব আব্দুর রশীদ সালাম গ্রহণ করেন।


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করলে, মধ্যরাতের পর বঙ্গবন্ধু ওয়ারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষনা তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এবং বয়কনিষ্ঠ এমপিএ ফজলুর রহমান খান ফারুক মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে সংগ্রহ করে আনেন এবং এই ঘোষনা টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সলিমুল্লাহ মুসলীম হলের জি.এস আনোয়ারুল আলম শহীদ ও টাঙ্গাইল জেলা ছাত্রলীগের নেতা ফারুক আহমদ মাইকযোগে সমগ্র টাঙ্গাইল শহরে প্রচার করেন। 


২৬ মার্চ টাঙ্গাইল থানায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি। তৎকালীন এমপিএ জেলা আওয়ামীলীগ নেতা বদিউজ্জামান খানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত হয় হাই কমান্ড। হাই কমান্ডের সদস্য ছিলেন টাঙ্গাইল থেকে নির্বাচিত সকল এম.এন.এ ও এম.পি.এ এবং এডভোকেট নূরুল ইসলাম। শ্রমিক নেতা হাবিবুর রহমান খান প্রমূখ। উক্ত হাই কমান্ডের কমান্ডার ইন চীফ এর দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা এমপিএ আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী । এডভোকেট নূরুল ইসলামের পূর্ব আদালতপাড়াস্থ বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই হাই কমান্ড গঠিত হয়। ২৭ মার্চ বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত এক জনসভার মাধ্যমে হাই কমান্ডের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং হাই কমান্ড টাঙ্গাইলের প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তৎকালীন উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা খন্দকার আসাদুজ্জামান সিএসপি টাঙ্গাইল এসে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি সমর্থন ঘোষনা করেন এবং তাকে হাই কমান্ডের উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। টাঙ্গাইলের তৎকালীন জেলা পরিষদ কার্যালয়কে (পুরাতন ফৌজদারী ভবন) হাই কমান্ডের কার্যালয় করা হয়। হাই কমান্ডের অফিস সেক্রেটারীর দায়িত্বে ছিলেন নৈয়ম উদ্দিন আহমেদ মুক্তার। হাই কমান্ডের সর্বাধিনায়ক জনাব আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করা হয় এবং বিভিন্ন স্কুল কলেজের ল্যাবরেটরী থেকে এসিড সংগ্রহ করে হাত বোমা ও মলোটন্ড ককটেল তৈরী করা হয়। এই কাজে আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দসহ বামপন্থী ছাত্রনেতা বুলবুল খান মাহবুব, শ্রমিক নেতা সৈয়দ আব্দুল মতিন প্রমূখ সক্রীয় ভূমিকা রাখেন। 


সেই সময় টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি অবস্থান করছিল। ২৭ মার্চ ভোরে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ছাত্র যুবসমাজ তাদেরকে ঘিরে ফেলে। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী সৈন্যরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বেরিয়ে আসে। কোম্পানি কমান্ডার মেজর কাজেম কামালসহ পাকিস্তানী ২ জন অফিসারকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে মেজর শফি উল্লাহ এসে তাদের হত্যা করেন। এক পর্যায়ে মার্চ মাসের শেষেরদিকে মেজর শফি উল্লাহর নেতৃত্বে জয়দেবপুর থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী সৈন্যরা অস্ত্র গোলাবারুদ ও সামরিক যানসহ টাঙ্গাইলে আসেন। হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে তাদেরকে টাঙ্গাইলে সংবর্ধনা দেয়া হয়। পরে তারা ময়মনসিংহ এর দিকে চলে যান।


এপ্রিলের শুরুতে খবর আসে, যে কোন সময় পাকবাহিনী ঢাকা হতে টাঙ্গাইলে প্রবেশ করবে। এজন্য মির্জাপুর থানার গুড়ান সাটিয়াচড়া নামক স্থানে ছাত্রজনতা ও ইপিআর সদস্যদের সমন্বয়ে প্রতিরোধ বুহ্য তৈরী করা হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন এমপিএ ফজলুর রহমান ফারুক। ৩ এপ্রিল পাকবাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশ পথে গুড়ান সাটিয়াচড়া নামক স্থানে এসে পৌঁছলে তুমুল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। কয়েক ঘন্টা যুদ্ধের পর ছাত্র যুবক ও ইপিআরের প্রতিরোধ বুহ্য ভেঙ্গে পড়ে। ৬ জন ইপিআর ও ছাত্রলীগ নেতা জুমরাতসহ ৩৩৭ জনকে পাকবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে এবং গুড়ান সাটিয়াচড়া গ্রাম ২টি আগুনে ভস্মীভূত করে। পরে তারা ঐদিনই বিকেলের দিকে টাঙ্গাইলে প্রবেশ করে। পাকবাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশের সময় যে মর্টারসেল নিক্ষেপ করেছিল সেই মর্টারসেলের আঘাতে শহরের পাড়দিঘুলীয়া গ্রামের শাহাবুদ্দীন মাস্টার, তার পুত্র ছাত্রলীগ নেতা ছানোয়ার হোসেন অনু এবং যুবক আব্দুল কদ্দুস শাহাদত বরণ করেন। পাকবাহিনী টাঙ্গাইলে আসার ঘোষনা বামপন্থী শ্রমিক নেতা সৈয়দ আব্দুল মতিন সকল ভয়ভীতি উপক্ষো করে শহরে প্রচার করেন। পাকবাহিনী শহরে প্রবেশ করে খন্দকার আসাদুজ্জামানের বাড়ী, বদিউজ্জামান খানের বাড়ী, এডভোকেট নূরুল ইসলামের বাড়ী ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয় এবং জনাব আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর বাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পাক বাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশের পূর্ব মূহুর্তে খন্দকার আসাদুজ্জামানের সহায়তায় কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ফারুক আহমদ, মোঃ সহরাওয়ার্দী, এনএ খান আজাদ, মিন্টু খান, সুখন, কালা ফারুক প্রমুখ টাঙ্গাইল ট্রেজারি থেকে পুলিশের সকল রাইফেল,গোলাবারুদ ২টি ট্রাকে করে নিয়ে প্রথমে ঘারিন্দা ও পরে বিভিন্নভাবে টাঙ্গাইলের পাহাড়ী এলাকা বর্তমান সখিপুর উপজেলাধীন মরিচা নামক স্থানে নিয়ে যান। পরবর্তীতে কাদেরীয়া বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে এই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করা হয়।


টাঙ্গাইল হাই কমান্ডের সর্বাধিনায়ক আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ইপিআরের একটি বাহিনী নিয়ে ঘাটাইল কালিহাতীর হামিদপুর বেতড়ুবা নামক স্থানে প্রতিরোধ বুহ্য রচনা করেন। কাদের সিদ্দিকীসহ ছাত্র যুবকেরাও এই প্রতিরোধে অংশ নিয়েছিল। ঐ স্থানে পাক বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ সংগঠিত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ভারতে চলে যান। ভারত থেকে ফিরে পরবর্তীতে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে টাঙ্গাইলে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত হতে থাকে।  পাহাড়ী এলাকায়, আনোয়ারুল আলম শহীদ, মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী, নূরুন্নবী, আজীজ বাঙ্গাল, সৈয়দ জিয়া আব্দুল আলীম, আবুল কালাম আজাদ, আঃ কদ্দুস, এনায়েত করিম, সোহরাব আলী খান আরজু, খোদা বক্স, আমানউল্লাহ বুলা, সৈয়দ শাজাহান প্রমুখের নেতৃত্বে ভূঞাপুর এলাকায়, সৈয়দ নূরুল ইসলামের নেতৃত্বে গোলড়া এলাকায় এবং খন্দকার আব্দুল বাতেনের নেতৃত্বে নাগরপুর এলাকায় মুক্তিবাহিনী সংগঠিত হতে থাকে। পরবর্তীতে আব্দুল কাদের সিদ্দিকীকে সর্বাধিনায়ক স্বীকার করে খন্দকার আব্দুল বাতেন ছাড়া সকলেই তার নেতৃত্ব মেনে নেয়। এইভাবে গড়ে উঠে টাঙ্গাইলের বিশাল কাদেরীয়া বাহিনী। কাদেরীয়া বাহিনী গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে ফারুক আহমদ সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।  মে মাসে নাট্যকার মামুনুর রশিদ, মোয়াজ্জেম হোসেন খান, কবি রফিক আজাদ, কবি মাহবুব সাদিক প্রমুখ কাদেরীয়া বাহিনীতে যোগ দেন।


মে মাসে সখিপুরের মহানন্দপুর গ্রামে মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপিত হয়। আনোয়ারুল আলম শহীদকে বেসামরিক প্রধান ও হামিদুল হককে উপ-প্রধান নিয়োগ করা হয়। মুক্তিবাহিনীর একটি সাপ্তাহিক মুখপাত্র ‘‘রণাঙ্গন’’ প্রকাশিত হতে থাকে। এর সম্পাদক ছিলেন রনদূত (আনোয়ারুল আলম শহীদ), সহ-সম্পাদক ফারুক আহমদ ও সৈয়দ নূরুল ইসলাম। বেসামরিক প্রধানকে সহায়তা করার জন্য সৈয়দ নূরুল ইসলাম, ফারুক আহমদ ও আব্দুল্লাহ কে বেসামরিক প্রধানে বিশেষ সহকারী নিয়োগ করা হয়। আব্দুল আওয়াল সিদ্দিকী ও সরু আলী আজগরকে গণ সংযোগের দায়িত্ব দেয়া হয়। মোয়াজ্জেম হোসেন খান, এনায়েত করিম, আব্দুল আলীম, সৈয়দ জিয়া, আব্দুল হামিদ ভোলা ও খন্দকার নূরুল ইসলামকে আঞ্চলিক বেসামরিক প্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। বিশাল কাদেরীয়া বাহিনীকে প্রায় ৯৭টি কোম্পানিতে ভাগ করা হয়।


কাদেরীয়া বাহিনীর প্রাথমিক ট্রেনিং সেন্টার ছিল সখিপুরের বহেড়াতলীতে। মুক্তিবাহিনীর হেড কোয়ার্টার থেকে রণাঙ্গন পত্রিকা ছাড়াও বিভিন্ন দলিল স্ট্যাম্প, বিয়ের কাবিন নামা ও বিভিন্ন ফরম ছাপানো হতো। কাদেরীয়া বাহিনী প্রধান লিঁয়াজো অফিসার ছিলেন মোহাম্মদ নূরুন্নবী (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) এবং লিয়াজো অফিসার ছিলেন নূরুল ইসলাম, মোয়াজ্জেম হোসেন খান ও এ এম এনায়েত করিম। পরবর্তীতে এ এম এনায়েত করিমকে কাদেরীয়া বাহিনীর প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। কাদেরীয়া বাহিনী ছোট বড় অসংখ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে এবং প্রতিটি যুদ্ধে অসাধারণ নৈপূণ্য প্রদর্শন করে হানাদার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পর্যদস্ত করেছে। কাদের সিদ্দিকী এবং কাদেরীয়া বাহিনীর নাম মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই ছিল পাকহানাদার বাহিনীর জন্য চরম আতংকের। কাদেরীয়া বাহিনী একই সঙ্গে হিট এন্ড রান গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতি এবং মুক্তাঞ্চল তৈরি করে সম্মুখ যুদ্ধের রণনীতি ও রণ কৌশল ব্যবহার করেছে। টাঙ্গাইলের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধগুলোর মধ্যে গোড়ান-সাটিয়াবাড়ীর যুদ্ধ, কালিহাতী ও বল্লার যুদ্ধ, কামুটিয়ার যুদ্ধ, যমুনা নদীর সারিয়াকান্দী মাটিকাটার বিখ্যাত জাহাজ মারার যুদ্ধ, ধলাপাড়ার (মাকরাই) যুদ্ধ, নখিরপুরের যুদ্ধ। কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কাদেরীয়া বাহিনীর দামাল যোদ্ধারাই ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সাথে প্রথম ঢাকা শহর দখল করে পল্টনে প্রথম জনসভা করে।

 

মুজিবনগর সরকার কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যে ১১ টি সেক্টর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তাছাড়াও অতিরিক্ত একটি বেসামরিক সেক্টর  প্রক্রিয়ায় কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে উঠে। টাঙ্গাইল জেলা (আরিচা নগরবাড়ী থেকে ফুলছড়ি বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত নদীর সর্বত্র), জামালপুর, নেত্রকোণার অংশ বিশেষ, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ জেলার ব্যাপক অংশ এবং গাজীপুর ও ঢাকা জেলার উত্তরাঞ্চল এই বাহিনীর যুদ্ধাঞ্চল ছিল।এ সময় আন্দিগ্রামে গড়ে উঠে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আর অস্ত্রাগার। ডাঃ শাহজাদা চৌধুরী, ডাঃ নিশি কান্ত সাহা ও আমজাদ হোসেনের তত্ত্ববধানে প্রতিষ্ঠিত হয় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হাসপাতাল।


আগস্টে মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে কমান্ডার হাবিবুর রহমান জানতে পারে এস.ইউ. ইঞ্জিনিয়ারর্স এল সি- ৩ এবং এস টি রজার নামে পাকিস্তান নৌবাহিনীর দু’টি জাহাজ অস্ত্র গোলাবারুদ বোঝাই করে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছে। তিনি তার কোম্পানী নিয়ে মাটিকাটা গ্রামে  নদীর বাঁকে যুৎসই পজিশন নেন এবং সুযোগ বুঝে (১২ আগস্ট ১৯৭১) তিন ইঞ্চি মর্টার চালিয়ে জাহাজের ইঞ্জিনভাগ ধ্বংস করেন। পাকিস্তানি নাবিকরা নদীতে ঝাপ দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর হাজার খানেক স্বেচ্ছাসেবক, শতাধিক নৌকা দিয়ে জাহাজের অস্ত্রশস্ত্র নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করেন। তারপর জাহাজে আগুন লাগিয়ে দেন। এই অপারেশনে সাহায্য করে জাহাজের কর্মীরা। জাহাজের সেই আগুন এতাটা প্রকান্ড আকার ধারণ করে যে বহুদূর থেকে লাখ লাখ মানুষ মুক্তিবাহিনীর সাফল্যে উল্লাসে ফেটে পড়ে। এরপরেই ঢাকা থেকে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্লেন এসে মুক্তিবাহিনীর উপর গোলাবর্ষণ করে। এতে মুক্তিবাহিনীর কিছু ক্ষতি হয়। কিন্তু জাহাজ ধ্বংসে এতোটাবড় ক্ষতি পুরো পাঁচ মাসের যুদ্ধে পাকবাহিনীর কখনো হয়নি। কারণ অস্ত্র বোঝাই জাহাজটি ধ্বংসের ফলে পুরো উত্তরবঙ্গে পাকবাহিনীর অপারেশনে বাধা সৃষ্টি হয় এবং জাহাজের লগবুক ও মুভমেন্ট কভারের হিসেবে জাহাজে একলক্ষ বিশ হাজার বাক্সে ২১ কোটি টাকার অস্ত্র-শস্ত্র ছিল। জাহাজ ধ্বংসের জন্য পাকসেনারা প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে ভূঞাপুর সদর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ছাবিবশা গ্রামে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর পাক-হানাদাররা গ্রামটিতে গণহত্যা চালায়। একই দিনে্ ৩২ জন নারী-পুরষ ও শিশুকে হত্যা করে পাক হানাদাররা ছাবিবশা গ্রামে প্রায় ৩৫০ টি ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়।


ষোল নভেম্বর মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী যুদ্ধকৌশল ও যুদ্ধপরিকল্পনা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তাঁর কামরায় টাঙ্গানো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা সম্বলিত মানচিত্র দেখিয়ে বলেছিলেন, আমার মনে হয়, কাদের সিদ্দিকী উইল বি দ্যা ফাস্ট ম্যান টু রীচ ঢাকা। উল্লেখ্য যে, এমএজি ওসমানীর এই ভবিষ্যৎবাণী এক মাস পর ঠিক ঐ একই তারিখে (১৬ ডিসেম্বর) অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিলো।


নভেম্বরে মিত্রবাহিনীর লেঃ জেনারেল আরোরা ও মেজর জেনারেল গিলের সঙ্গে কাদেরীয়া বাহিনীর লিয়াজো প্রধান নুরুন্নবী যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ো পরামর্শ করেন। তাদের এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আরোরা জানান যে, ভারত সরকারীভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হলে টাঙ্গাইলে ছত্রিসেনা নামাতে পারেন-যদি তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা টাঙ্গাইলের মুক্তিবাহিনী করতে পারে। এ ব্যাপারে নুরুন্নবী টাঙ্গাইল মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের পূর্ণ আশ্বাস দেন। এরপর মিত্রবাহিনী টাঙ্গাইল ল্যান্ড করে।১১ ডিসেম্বর পাকবাহিনী জামালপুর ও ময়মনসিংহ ত্যাগ করে ঢাকা যাবার পথে বিভিন্নস্থানে কাদেরীয়া বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ বিধস্ত ও ধ্বংস হয়ে যায়। অসংখ্য হানাদার সেনা নিহত ও বন্দী হয়। 


ময়মনসিংহ বা জামালপুর মুক্ত না হওয়ায় ঢাকার পথে মিত্রবাহিনীর কয়েকটি কোম্পানি সাভার জয়দেবপুরের দিকে পাঠানো হয়। বাংলাদেশ ভারত যৌথবাহিনীর পরিকল্পনা ছিল সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া পাকবাহিনীকে পরাস্ত করা ও ঢাকা মুক্ত করা। টাঙ্গাইল-ঢাকা যাত্রাপথ তাড়াতাড়ি মুক্ত করতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হওয়ার কথা কিন্তু হানাদার বাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা তখন নিস্তেজ হয়ে গেছে। তাই তারা সহজেই আত্মসমর্পন করে। আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইল মুক্তিবাহিনীর প্রধান আবদুল কাদের সিদ্দিকী ও অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। 


স্বাধীনতা যুদ্ধে বাতেন বাহিনীর ভূমিকা

এতদব্যতীত খন্দকার বাতেন (৭১-এ সরকারি সাদত কলেজের ছাত্রসংসদের সহসভাপতি)-এর নেতৃত্বে গঠিত বাহিনী দক্ষিণ টাঙ্গাইলে ঢাকা জেলার কিছু অংশ, গাজীপুর, পাবনা, মানিকগঞ্জ জেলার কিছু অংশ ও সিরাজগঞ্জ জেলার ব্যাপক অংশে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। বাতেন বাহিনীতে সাড়ে তিন হাজার সশস্ত্র যোদ্ধা ছিলো। একুশটি কোম্পানির সমন্বয়ে বাতেন বাহিনী গঠিত ছিলো। এই বাহিনীতে তেষট্টিটি প্লাটুন এবং একশতটি সেকশন ও তিনটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিলো। ১৯৭১ সালের মে মাসের ৪ তারিখে খন্দকার আব্দুল বাতেন তার বাহিনী নিয়ে মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর থানা আক্রমণ করে যুদ্ধ শুরু করেন। এছাড়া মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর থানা আক্রমণ, সিরাজগঞ্জের চৌহালী থানা আক্রমণ, মানিকগঞ্জ জেলার ঘিউর থানা দখল, বাতেন বাহিনীর সাটুরিয়া আক্রমণ ও দখল বীরত্বপূর্ণ।


১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বাতেন বাহিনীর একটি যুদ্ধ সংগঠিত হয়, টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার কোনড়া গ্রামে। হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা টাঙ্গাইল থেকে পালিয়ে যাবার পথে টাঙ্গাইল জেলা সদরের প্রায় ১৫ মাইল দক্ষিণে কোনড়া গ্রামে পৌঁছালে সেখানে বাতেন বাহিনীর বীর যোদ্ধারা আক্রমণ করে। হানাদারদের সঙ্গে এখানে বাতেন বাহিনীর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বাতেন বাহিনীর বীর যোদ্ধা আব্দুর রব হানাদারদের গুলিতে শহীদ হন এবং সুবেদার মেজর তাহের হানাদার সৈন্যদের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন। কোনড়ার যুদ্ধে হানাদারদের প্রচুর জীবনহানি ঘটে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে গভীর রাতে বহু লাশ ও অস্ত্রশস্ত্র ফেলে হানাদার সৈন্যরা ঢাকার দিকে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে টাঙ্গাইল পর্বে বাতেন বাহিনীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। নাগরপুরে বাতেন বাহিনীর প্রতিরোধ পাক হানাদারদের টটস্থ করে রাখতো। ফলে হানাদাররা নানা ধ্বংসযজ্ঞ চালায় বিভিন্ন গ্রামে। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর নাগরপুরের বনগ্রাম গ্রামে পাকবাহিনী ব্যাপক লুটতরাজ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং সারেংপুর গ্রামে একই পরিবারের ৭ জনকে হত্যা করে। তাদের গণকবর দেয়া হয়। এই ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতি নাগরপুরবাসীকে আজও শোকহত করে।


টাঙ্গাইলে আট হাজারের উপরে মুক্তিযোদ্ধা ,মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁদের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। টাঙ্গাইল  সকল বাহিনী ও জনগণের প্রচেষ্টায় ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল হানাদার মুক্ত হয়।



টাঙ্গাইল জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ( উপজেলা ভিত্তিক )

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা.pdf

২. সখিপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

৩. ঘাটাইল উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

৪. দেলদুয়ার উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

৫. মির্জাপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

৬. ভূঞাপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

৭. নাগরপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

৮. মধুপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

৯. ধনবাড়ী উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

১০. গোপালপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

১১. কালিহাতী উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা

১২. বাসাইল উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা